আমার সম্পর্কে

হ্যালো! আমি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম। আমি কোডিং করতে, নতুন নতুন জিনিস শিখতে এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করতে ভীষণ ভালোবাসি।

Friday, 11 September 2026

সন্তানদের কীভাবে নামাজের প্রতি আগ্রহী করবেন? | প্যারেন্টিং ও নামাজের গুরুত্ব

Mohammad Shahidul Islam | Web Developer & SEO Expert 

 যখন কোনো মানুষ নামাজ নিয়ে অলসতা করে, আমি তিন-চার বছরের বাচ্চা সম্পর্কে কথা বলছি না এবং আমি ছয় বছরের কাউকে নিয়েও কথা বলছি না। আমি এমন বাচ্চাদের নিয়ে কথা বলছি যারা এখন বুদ্ধিসম্পন্ন। বাবা, পুত্র বা কন্যা মিলে একই লেভেলের ভিডিও গেম খেলতে পারে। তারা একই ধরনের টিভি শো দেখতে পারে। তারা এমন একটি লেভেলে পৌঁছে গেছে যে তারা এখন উচ্চস্তরের বিষয়গুলো হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। 


আপনার যেসব বিষয়ে আগ্রহ আছে, তার কিছু কিছুতে তাদেরও আগ্রহ আছে। টিভিতে আপনি যদি কোনো খেলা দেখেন, তারাও আপনার সাথে দেখে। কিছু কিছু বিষয়ে তারা বুদ্ধিগত দিক থেকে আপনার সমপর্যায়ের। অবশ্যই তারা শিশু। তাদের ব্রেইন এখনো পুরোপুরি পূর্ণতা পায়নি। এখনো কম ক্ষমতাসম্পন্ন। কিন্তু কিছু পর্যায়ে তারা ইতিমধ্যেই বুদ্ধিমান সত্তা হয়ে গেছে। এবং এখন তারা নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করছে। তারা নিজের জন্য চিন্তা করতে পারে এবং বুদ্ধিমান প্রশ্ন করতে পারে। 


অতএব নবীন কিশোর-কিশোরীরা, তোমরা যারা শ্রোতাদের মধ্যে বসে আছ, তোমাদের শিশু হিসেবে সম্বোধন করছি না। আমি তোমাদের কিশোর-কিশোরী হিসেবে সম্বোধন করছি। মনে করো তোমাদের বাবা তোমাদের সাথে কথা বলছে বা তোমাদের মা তোমাদের সাথে এই ব্লগে কথা বলছে। আমি ধরে নিচ্ছি যে আমি আমার নিজের সন্তানদের সাথে কথা বলছি এই ব্লগে। আমি মিম্বরে না, আমি বাসায় বসেই আমার বাচ্চার সাথে কথা বলছি। তখন আমি কীভাবে তাদেরকে নামাজ পড়তে বলব? 


প্রথম যে বিষয়টা বলে আমি কথা শুরু করতে যাচ্ছি তা হলো—প্রিয় সন্তান, এমন একটি সময় ছিল যখন আমি তোমার কথা জানতাম না, তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না, তোমার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, আমি তোমার ব্যাপারে কোনো পরোয়া করতাম না, তোমার কথা কখনো চিন্তা করতাম না, তুমি আমার নিকট কিছুই ছিলে না (লাম ইয়াকুন শাইয়ান মাজকুরা)। 


কুরআন বলছে, মানুষের জীবনে এমন একটা সময় ছিল যখন কেউ তাকে স্মরণ করত না, একেবারেই না। আমি তোমাকে একটুও ভালোবাসিনি কারণ তুমি আমার নিকট জিরো ছিলে, কিছুই না। কিন্তু হঠাৎ করে আমার জীবনে তোমার আগমন ঘটল। এমনকি যখন আমি জানতে পারলাম যে তোমার মা তোমার জন্ম দেবে, যখন সে তার পেটের মধ্যে তোমাকে বহন করে চলছিল, এমনকি তোমার মা-ও ভাবত, "কেমন হবে আমার সন্তানটা?" কিন্তু আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমার কাছে কোনো তথ্য ছিল না। আমার একটা অংশ এই ভয়ে থাকত যে, "তুমি হয়তো আমার মতো হবে।" কিন্তু আমার কোনো ধারণাই ছিল না কেমন মানুষ হবে তুমি। 


এমনকি তুমি যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিলে, তুমি যখন একদম ছোট বাচ্চা ছিলে, আমি আসলে জানতাম না তুমি কে। আমি শুধু জানতাম তোমাকে খাওয়াতে হবে, আর মাঝে মাঝে তোমার থেকে দুর্গন্ধ আসত। এছাড়া তোমার সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানতাম না। এখন তুমি যেহেতু বড় হয়ে উঠছ, এখন আমরা পরস্পর কথা বলতে পারি এবং যোগাযোগ করতে পারি। তুমি স্কুলে যাচ্ছ, আমরা একই বাড়িতে বাস করি। 


আমি শুধু তোমাকে জানাতে চাচ্ছি, আমাদের মধ্যে এই সম্পর্কটি সবসময় বর্তমান ছিল না। আমি তোমাকে আরো জানাতে চাই, এই সম্পর্কটি সবসময় বর্তমান থাকবেও না। খুবই অল্প কিছু সময়ের জন্য আমরা দুজন একত্রে থাকব। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তুমি পুরোপুরি বড় হয়ে যাবে। তুমি যুবক হওয়ার পথে। এটা খুব দূরের জিনিস না। বস্তুত, তোমার বাচ্চাকাল থেকে এখন পর্যন্ত সময়টাকে আমার কাছে এক মাসের মতো মনে হয়। চোখের পলকে তুমি এখনকার তুমি হয়ে গেছ। কিছু বুঝে উঠতে উঠতেই তুমি বড় হয়ে যাবে। একদিন ইউনিভার্সিটিতে যাবে, চাকরি করবে, বিয়ে করবে—এর সবকিছুই ঘটবে ইনশাআল্লাহ। 


যদি আল্লাহ ইচ্ছে করেন, যখন ওই ব্যাপারগুলো ঘটবে তখন আমাদের সম্পর্কটা আর আজকের মতো থাকবে না। বাড়িতে এসে তুমি আমার কাছে ছুটে আসবে না। তুমি আমার সাথে সময় কাটাবে না। তোমার তখন নিজের চাকরি থাকবে, পরিবার থাকবে, স্ত্রী থাকবে বা স্বামী থাকবে। তোমার তখন নিজের জীবন থাকবে। সুতরাং আমাদের হাতে একত্রে যে সময়টুকু আছে তা খুবই সীমিত। এমনকি এই সময়টুকুতেও তোমার স্কুল আছে, আমার চাকরি আছে, আমাকে বাজার করতে হয়। আমাদের হাতে হয়তো দৈনিক ২০ মিনিট সময় থাকে সত্যিকারের কথা বলার। আমাদের একসাথে অতিশয় সংক্ষিপ্ত কিছু সময় থাকে। 


তুমি যখন বড় হয়ে যাবে, তখন আমার সম্পর্কে তুমি শুধু আমাদের একত্রে কাটানো ওই গুটিগুটিক মুহূর্তগুলোর কথাই স্মরণ রাখবে। কারণ আমাদের কাছে একত্রে কাটানোর মতো ২৪ ঘণ্টা নেই, আমাদের নেই। তো মোট কথা, প্রথম যে জিনিসটি আমি তোমাকে জানাতে চাই তা হলো, আমি তোমাকে কোনো মতে চিনি। আমি জানি আমরা একত্রে বাস করি, কিন্তু আমি সত্যিই তোমার সম্পর্কে খুবই অল্প জানি। কেন জানো? কারণ কোনো মানুষ অন্য কোনো মানুষকে সত্যিকার অর্থে চেনে না। তুমি যা যা চিন্তা করো তার সবটা তো আমাকে বলো না। আর আমিও নিজের চিন্তার সবকিছু তোমাকে জানাই না। 


কিন্তু এমন এক সত্তা আছেন যিনি তোমাকে চিনতেন। এমনকি যখন তুমি আমার নিকট কিছুই ছিলে না, তখনও এমন এক সত্তা আছেন যিনি তোমাকে তখনও ভালোবাসতেন যখন সৃষ্টিজগতের কেউই তোমাকে ভালোবাসত না। এই জগতের কেউই তোমাকে স্নেহ করত না। এমন এক সত্তা আছেন যার সাথে তোমার সম্পর্কটা আগামীতেও থাকবে। যদিও তোমার-আমার সম্পর্ক আগামীতে পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। ছোটবেলায় আমার বাবার সাথে আমার এক ধরনের সম্পর্ক ছিল, কলেজে পড়ার সময় তার সাথে সম্পর্কটা অন্য ধরনের ছিল, আর এখন তার সাথে আমার সম্পর্কটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। যদিও আমরা একই মানুষ আছি, কিন্তু আমাদের সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন এসে গেছে। 


কিন্তু একজন এমন আছেন যিনি সর্বদা তোমাকে ভালোবেসে গেছেন, তোমাকে নিরাপত্তা দিয়ে গেছেন, তোমার ভালোর জন্য পরিকল্পনা করে গেছেন, তোমার যত্ন নিয়েছেন একেবারে শুরু থেকেই। আর তিনি সবসময় তা করে যাবেন। আর সেই সত্তা আমি নই। আমি তোমার জীবনের একটা পর্ব মাত্র। এটা সুন্দর একটা পর্ব যা আল্লাহ তোমাকে-আমাকে একত্রে দান করেছেন। কিন্তু এটা কোনো স্থায়ী পর্ব নয়। এটা ছিল প্রথম ব্যাপার যা আমি তোমাকে জানাতে চেয়েছি। 


দ্বিতীয় যে বিষয়টি আমি তোমাকে জানাতে চাই তা হলো, আমি যখন তোমাকে নামাজ পড়তে বলি বা কোনো কিছু করতে বলি, তোমার তখন মনে হয় আমি তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করছি, তোমার ওপর বসগিরি দেখাচ্ছি, তোমাকে কেবল এটা-ওটা করতে বলি। আমি চাই তুমি জেনে রাখো, আমার পক্ষে আসলে তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আমি তোমাকে উপদেশ দিতে পারি, কঠোরতা দেখাতে পারি মাঝে মাঝে—এটা সত্য। কিন্তু অতিসত্বর তুমি এতটা বড় হয়ে যাবে যে, তখন যত জোরেই আমি চিৎকার-চেঁচামেচি করি না কেন, আমার কণ্ঠস্বর যত উঁচুই করি না কেন, যত হতাশাই ব্যক্ত করি না কেন, এতে কোনো লাভ হবে না। 


কারণ তোমার সিদ্ধান্তগুলো তুমিই নেবে। তুমি এরকম বলবে, "আচ্ছা বাবা, আমি একটু পরে তোমাকে কল দিচ্ছি। আমাকে এখন যেতে হবে, আরেকটা কল এসেছে।" তুমি তখন আমাকে অপেক্ষায় রাখবে আর নিজের কোনো প্রয়োজন সারবে। মূলত অধিকাংশ সময় তোমার পছন্দ-অপছন্দের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণই থাকবে না। তুমি যখন স্কুলে থাকো এবং বন্ধুদের সাথে আড্ডা দাও, তাদের সাথে কথাবার্তা বলো, আমি ওইসব কথাবার্তার কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করি না। আর আমি যদি ইতিমধ্যেই তোমাকে আইপ্যাড বা ফোন বা এরকম কিছু দিয়ে থাকি, আর এগুলো দিয়ে তুমি তোমার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করো, তুমি তখন কোন ধরনের যোগাযোগ করো তার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণই থাকে না। 


এমনকি যদি আমি ওইসব ডিভাইসে প্যারেন্টিং কন্ট্রোল অ্যাপস ইন্সটল করে দিই, তবুও আমি তোমার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পেতে পারি, কিন্তু সেটা খুবই সীমিত। তবে এমন একজন আছেন যিনি নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন তোমার শরীরের প্রতিটি কোষ। একসময় তুমি যে মাইক্রোস্কোপিক তরল পদার্থ ছিলে সেটাও তিনি নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন, যা তোমার মায়ের গর্ভে বড় হচ্ছিল। যা নিয়ন্ত্রণ করছিল তোমার জেনেটিক ক্রম, যার ওপর ভিত্তি করে তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কেমন হবে তোমার শরীরের রং, তোমার চুলের আকৃতি, তোমার চোখ, তোমার বুদ্ধি কেমন হবে, তুমি কতটা লম্বা বা বেঁটে হবে—এর সবকিছুই তিনিই নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। তোমার ওপর আসলে তাঁর নিয়ন্ত্রণ আছে, আমার নয়। 


আমার একটি কথা মনে পড়ে গেল যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মেয়ে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেন, "ইয়া ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, ইত্তাকিল্লাহ।" ও ফাতিমা মুহাম্মাদের কন্যা, আল্লাহর ব্যাপারে সচেতন থাকো। আল্লাহর নিকট আমার কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না তোমার ব্যাপারে। 


এখন আমরা পরবর্তী পয়েন্টে এসে গেছি যা এই কথার সাথে সম্পর্কিত। আমার যেহেতু নিয়ন্ত্রণ নেই, সত্য হলো তোমার ব্যাপারে আমি যতই রক্ষণশীল হই না কেন আর আমি চাই যে তুমি ভালো করো, তবুও তোমার ভালো আমি নিয়ন্ত্রণ করি না আর আমি এর জন্য দায়বদ্ধ নই। আল্লাহ প্রতিটি মানবকে তার নিজের জন্য দায়বদ্ধ করে সৃষ্টি করেছেন। 


দেখো, তুমি যদি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করো, যদি একদিন ড্রাইভিং লাইসেন্স পাও এবং এরপর রাস্তায় লাল বাতি উপেক্ষা করে চলে যাও, পরে পুলিশ তোমাকে ধরল—তখন তো তুমি বলতে পারবে না, "আপনি একটু আমার বাবার সাথে কথা বলতে পারবেন?" না, তোমার নিজেকেই এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। তোমার ইউনিভার্সিটি প্রফেসর যখন তোমাকে ফেইল মার্ক দেবে, তখন তো বলতে পারবে না, "একটু থামুন, আমার মাকে একটু কল দিই।" না, তুমি নিজেই এই ফেইলের জন্য দায়ী। আইনের কোর্টে তোমার কাজের জন্য তুমি দায়ী। ইউনিভার্সিটিতে তোমার পাস-ফেইলের জন্য তুমি দায়ী। তোমার চাকরিতে তুমি তোমার জন্য দায়বদ্ধ। তোমার স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে, তুমি কী আহার করো, তুমি তোমার জন্য দায়বদ্ধ। নিজেকে যেকোনো বিপদে ফেললে এবং নিজের কোনো ক্ষতি করলে তুমি দায়বদ্ধ তোমার জন্য। 


তোমার বয়স যত বাড়বে, তোমার স্বাধীনতা যত বাড়বে, তোমার দায়বদ্ধতাও তত বৃদ্ধি পাবে। কেউ তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে না এবং তোমার কাজের জন্য অন্য কেউ দায়ী হবে না। (লা তাযিরু ওয়াযিরাতুঁউ উইযরা উখরা)। কোনো ভার বহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। 


আমি আসলে তোমার জন্য দায়ী নই। আর শেষ বিচারের দিন আমরা প্রত্যেকে সম্পূর্ণ একাকী আল্লাহর সামনে উপস্থিত হব। এখন এই দুনিয়াতে আমরা একসাথে একত্রে বসবাস করছি, আমরা একই পরিবারের সদস্য, আমরা কোলাকুলি করি, আমি আমৃত্যু তোমাকে ভালোবাসি, আমি সর্বদা তোমাকে নিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু সামনে এমন একটা দিন আসছে যেদিন আমরা আমাদের সমগ্র অস্তিত্বের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ সময় পার করব। বস্তুত, শেষ বিচারের দিন তুমি যদি আমার কাছে দৌড়ে আসো, এমন হতে পারে যে আমি তোমার থেকে দৌড়ে পালাব। "তোমাকে চিনি না আমি, দূর হও আমার কাছ থেকে। আমি এখন আমার হিসাব নিয়ে চিন্তিত।" 


কারণ তোমার সাথে আমার সম্পর্কটি ছিল সামান্য কয়েকটি ক্ষুদ্র সেকেন্ডের জন্য—আল্লাহর সাথে সম্পর্কের তুলনায়। যে সম্পর্কটি আরো অনেক বড়, অনেক বেশি পুরোনো। আর ওটা থাকবে আরো বেশি সময় ধরে। আমাকে এখন ওই সম্পর্কটা নিয়ে ডিল করতে হবে শেষ বিচারের দিন। অতএব আমাদের এই সম্পর্কটি—(ইয়াওমা ইয়াফিররুল মারউ মিন আখিহি, ওয়া উম্মিহি ওয়া আবিহি)। এই ধরনের সব আয়াত। লোকটি পালাবে তার মা থেকে, তার বাবা থেকে, তার ছেলেমেয়েদের থেকে, তার ভাইবোনদের থেকে, তার স্ত্রী বা স্বামী থেকে। কেউ কেউ ভাবছেন স্ত্রী থেকে পালানো? এটা তো আমি বর্তমানেও করি! 


তো পরবর্তী যে বিষয়টি আমি তোমাকে জানাতে চাই তা হলো, আমি তোমার কাছ থেকে সম্মান অনুভব করতে চাই, ঠিক যেভাবে তুমিও আমার প্রদত্ত যত্ন অনুভব করতে চাও। তুমি যখন কাউকে ভালোবাসো, তখন কেমন যেন তার কাছে তোমার একটা চাহিদা তৈরি হয়। আমার নিকট তোমার চাহিদা হলো বাসার সমস্ত প্রয়োজন ঠিকমতো মেটানো হচ্ছে। তো আমার দায়-দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত, আমার কাছে তোমার চাহিদা হলো আমি যেন কারেন্ট বিল প্রদান করি, ঘরের এসিটা যেন কাজ করে। তুমি চাও আমি যেন তোমার স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করি, তুমি চাও আমি যেন তোমাকে জামাকাপড় কিনে দিই। এগুলো আমার দায়িত্ব। আর আমি চাই তুমি যেন আমাকে কিছুটা সম্মান প্রদর্শন করো এবং শ্রদ্ধা দেখাও এবং আমার কথা শোনো। এগুলো তো সবাই বোঝে। 


কিন্তু আল্লাহর সাথে তোমার সম্পর্কটা অন্যরকম। তাঁর কাছ থেকে তোমার অনেক কিছু দরকার, কিন্তু তোমার কাছ থেকে তাঁর কোনো কিছুরই দরকার নেই। তোমাকে তাঁর একটুও প্রয়োজন নেই। আসলেই তাঁর কারোরই দরকার নেই বা কোনো কিছুরই দরকার নেই। চলো তোমার সম্পর্কে কথা বলি। তুমি যখন বলো, "আমাকে কেন নামাজ পড়তে হবে? আমার নামাজ আল্লাহর কেন এত দরকার?" তোমার কোনো কিছুরই আল্লাহর প্রয়োজন নেই। এই নামাজ কোনোভাবেই তাঁর উপকারে নয়। 


আল্লাহ এমনকি বলছেন, যখন কোনো কিছুই থাকবে না—চলো কুরআন থেকে একটা উদাহরণ দিই। যখন এই মহাবিশ্বে কিছুই থাকবে না। চলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য আল্লাহর গৌরব নিয়ে কথা বলি। সম্প্রতি বিশ্বকাপ চলার সময় আমি কাতারে ছিলাম। যেই টিম জয়লাভ করে (আর্জেন্টিনা জয়লাভ করে), তাদের জন্য এটা ছিল একটা দারুণ গৌরবময় মুহূর্ত। সবাই তাদেরকে নিয়ে আনন্দ-উৎসবে মুখর। কল্পনা করো, খেলোয়াড়টাকে নিয়ে উৎসব চলছে কিন্তু কোনো দর্শক নেই, কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো স্টেডিয়াম নেই, কিচ্ছু নেই। একটা লোক একা একা একটি দ্বীপে বাস করে। সে ফুটবলটাতে লাথি দিয়ে একটা গোল করে ফেলল। আর বলে উঠল, "ইয়ে, আমি সেরা!" কিন্তু কেউ তো সেখানে নেই। এমন ঘটনার কথা শুনলে মনে করবে এ লোকটি পাগল হয়ে গেছে, তাই না? 


গৌরব পেতে হলে গৌরব করার মতো একদল দর্শক থাকতে হবে। স্বীকৃতি পেতে হলে একদল মানুষ আশেপাশে থাকতে হবে যারা স্বীকৃতি দেবে। প্রশংসা পেতে হলে, কদর পেতে হলে—নিজে নিজে তো আর প্রশংসা পেতে পারো না, এমন কেউ থাকতে হবে যে তোমার জন্য এই প্রশংসাটা করবে। কিন্তু আল্লাহ বলেন, (কুল্লু মান আলাইহা ফান, ওয়া ইয়াবকা ওয়াজহু রাব্বিকা যুল জালালি ওয়াল ইকরাম)। তিনি বলেন, সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে এই ধরাপৃষ্ঠের, তথাপি তোমার রবের চেহারা থেকে যাবে। আল্লাহই একমাত্র সত্তা যিনি তখনও মহীয়ান এবং গরীয়ান। 


এমনকি যখন তাঁর প্রশংসা এবং গৌরব বর্ণনা করার কেউ থাকবে না। অন্য যে কারো ক্ষেত্রে কাউকে না কাউকে এটা করে দিতে হয়। তাই আল্লাহর প্রয়োজন নেই আমার নামাজের, আমার হালাল মুরগি খাওয়ার, আল্লাহর প্রয়োজন নেই আমার মন্দ বলা থেকে বিরত থাকার। তাই নিজের মাথা থেকে এই চিন্তা দূর করে দাও যে নামাজ পড়ার মাধ্যমে তুমি কোনোভাবে অন্য কারো উপকার করছ। আল্লাহ এমনকি বলছেন, তারা মনে করে তারা ইসলাম গ্রহণ করেই তোমাকে ধন্য করেছে। (লা তামুন্নু আলাইয়্যা ইসলামাকুম)। আমাকে বলতে এসো না যে তোমার ইসলামের মাধ্যমে তুমি কোনোভাবে আমার উপকার করেছ। (বালিল্লাহু ইয়ামুন্নু আলাইকুম)। বরং আল্লাহই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। 


এখন পরবর্তী বিষয়। আচ্ছা কেউ একজন নামাজ পড়ে না কেন? আমি তোমার সম্পর্কে বলছি না আমার প্রিয় ছেলে বা প্রিয় মেয়ে, শুধু প্রশ্নটি নিয়ে চিন্তা করো যে মানুষ কেন নামাজ পড়ে না। এর অনেকগুলো উত্তর থাকতে পারে। আর এই প্রশ্নের উত্তর আল্লাহর কাছেও আছে। উত্তরটা খুবই ভয়ঙ্কর। এই উত্তরটি আমি ব্লগের শুরুতে পড়েছি। তিনি বলেন, (ফালা সাদ্দাকা ওয়ালা সাল্লা)। সে আসলে সত্য গ্রহণ করেনি এবং সে নামাজও পড়েনি। 


তিনি কাফের সম্পর্কে বলছিলেন। তিনি দুইটা জিনিস বলেছেন—এই লোকটি সত্য গ্রহণ করেনি এবং নামাজও পড়েনি। কথাটা ভাবনার উদ্রেক করে। যদি বলা হয় সে সত্য গ্রহণ করেনি, আমার আশা হলো তিনি বলবেন, (লা সাদ্দাকা ওয়ালা আমানা)। কিন্তু তিনি বলছেন, (ফালা সাদ্দাকা ওয়ালা সাল্লা)। এর মানে হলো, আল্লাহর সত্য গ্রহণ করার ব্যাপারে তোমার অন্তরে কিছু একটা মিসিং আছে। 


"না না না!" বাচ্চাটা বলে, "আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, আমি মুসলিম!" হ্যাঁ, তুমি এখানে মুসলিম—তোমার মাথায়। কিন্তু এই সত্য তো শুধু তোমার মাথার জন্য না, এই সত্য তোমার অন্তরের জন্য। তুমি এখনো অনুভব করছ না যে ব্যাপারটা কেমন সিরিয়াস, তুমি এখনো উপলব্ধি করছ না যে এটা কী! মাঝে মাঝে কোনো বিষয় তুমি জানো হয়তো, কিন্তু এই নিয়ে চিন্তা করা থেকে পালিয়ে বেড়াও। এটা সত্য, তুমি জানো বিষয়টা, কিন্তু চিন্তা করতে চাও না। আর তাই এটা যেহেতু মিসিং, ঠিক এই কারণে আমি সহজেই নামাজের কথা ভুলে যাই কখনো কখনো, এবং তুমিও ভুলে যাও কখনো কখনো। এমনটা ঘটে কারণ আমাদের অন্তর কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে দ্বীনের এই সত্যতা, আল্লাহকে—সেই সত্যটা, সে অকাট্য সত্যটা আমাদের মস্তিষ্কের পেছনের কোনো একটা শেলফে গিয়ে পড়ে থাকে। আমরা অন্য কিছুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং এই নিয়ে আর চিন্তা করি না। 


আল্লাহ এটাই বলেছেন। সুতরাং তোমার নামাজ পড়া আল্লাহর প্রয়োজন নেই। এমনকি তুমি যদি নামাজ পড়ো—আমি পড়তে বলছি এই কারণে—তখন কী করো? নামাজের জন্য কীভাবে নিয়ত করো তখন? "আমি চার রাকাত নামাজ পড়ব, দাঁড়ালাম কারণ আমার আব্বা বারবার পড়তে বলছেন, আল্লাহু আকবার।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বলেছেন, নিয়ত সঠিক না হলে কাজের কোনো মূল্য থাকে না (ইন্নামাল আ'মালু বিন্নিয়্যাত)। এমনকি যদি তুমি কাজটা করেও থাকো, কিন্তু তোমার নিয়ত ছিল 'আমি শুধু তোমাকে বিরক্ত করি'—এটাই তোমার নিয়ত, তখন এই নামাজ আমার যেমন কোনো উপকার করবে না, ঠিক তেমনি তোমারও কোনো উপকার করবে না। তোমার সত্যিকারের আন্তরিক নামাজ থেকে একমাত্র উপকৃত হবে যে, সে হলো তুমি নিজে। 


এখন এটাই সেই প্রশ্নের উত্তর যে কেন একজন মানুষ নামাজ পড়ে না? আরো দুইটা কথা তোমার সম্পর্কে বলতে চাই। তার মাঝে একটা হলো নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য কী? কোন কারণে পড়ব? কারণ তুমি হয়তো ভাবছ নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য হলো তুমি যেন জাহান্নামে না জ্বলো। নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য হলো তুমি যদি নামাজ না পড়ো আল্লাহ তোমাকে ঘৃণা করবেন। নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য হলো তুমি যদি নামাজ না পড়ো তুমি শাস্তি পাবে অথবা তুমি আর মুসলিমই থাকবে না, ফেরেশতারা তোমাকে অভিশাপ দেবে—সমস্ত নেতিবাচক বিষয়। আল্লাহ ওই সমস্ত উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করেননি। 


নেতিবাচক কিছু থেকে মুক্তি পাওয়া নামাজের মূল উদ্দেশ্য নয়। নামাজের মূল উদ্দেশ্য হলো ইতিবাচক কিছুর দিকে ছুটে চলা। এটাই নামাজের উদ্দেশ্য। এমন দুই ছাত্রের মধ্যে পার্থক্য যেমন—একজন লেখাপড়া করে যেন সে ফেইল না করে, আর অন্যজন লেখাপড়া করে কারণ সে ওই সাবজেক্টটা পড়তে ভালোবাসে। একজন ছাত্র পড়ালেখা করছে পজিটিভ কিছুর জন্য, আর অন্যজন পড়ালেখা করছে কারণ সে এমন কিছু থেকে বাঁচতে চাচ্ছে যা নেগেটিভ। একজন কর্মচারী তার চাকরিটাকে দারুণ ভালোবাসে, আর অন্য একজন কর্মচারী শুধু চায় সে যেন চাকরিটা না হারায়। তারা একই চাকরি করছে, একেবারে অভিন্ন চাকরি। কিন্তু একজন চাকরিটা করতে পেরে কী যে খুশি! কত যে আনন্দ তার! আর অন্যজন খুবই হতাশ, সবসময় মনমরা ভাব। কেন? কারণ তাদের একজন এটা করছে ক্ষতিকর কিছু থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, আর অপরজন এটা করছে উপকারী কিছুর দিকে ছুটে চলার জন্য। 


আল্লাহ কুরআনে যখন আমাকে নামাজ সম্পর্কে বলেছেন যে কেন আমাদের নামাজ পড়া দরকার, তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে এই উত্তরটা বলে দিয়েছিলেন। যখন তিনি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি বলেছেন, (আকিমিস সালাতা লিজিকরি)। "আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।" তোমার নামাজ ঠিক রাখো যেন তুমি তোমার রবকে স্মরণ করতে পারো। 


আমি তোমাকে ইতিমধ্যেই বলেছি যে তোমার-আমার সম্পর্কটা খুবই সীমিত। কিন্তু তোমার সাথে আল্লাহর সম্পর্কটা অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছিল। আর তাঁর সাথে তোমার এই সম্পর্কটা অনন্তকাল ধরে বলবৎ থাকবে। তাই সেই সম্পর্কটির কথা স্মরণে আনা আবশ্যক। কারণ ভালো যত কিছু তোমার কাছে আসে তা আসে ওই সম্পর্কটা থেকেই। সামান্য কিছু ভালো জিনিস তোমার বাবার কাছ থেকে আসে। কিছু কিছু ভালো জিনিস। কিন্তু সকল ভালো জিনিস যা তোমার কাছে আসে তা আসে একমাত্র ওই সম্পর্কটির কারণে। যদি তুমি চাও সকল উপকারী জিনিস তোমার জীবনে অবস্থান করুক, তখন তোমাকে অবশ্যই তাঁর কথা স্মরণ করতে হবে যার নিকট থেকে সকল কল্যাণের আগমন ঘটে। যার নিকট থেকে সকল নিয়ামতের আগমন ঘটে, সকল রিজিকের আগমন ঘটে, সকল হিদায়াতের আগমন ঘটে। আর তাই আল্লাহ বলছেন, सर्वोत्तम যে উপায়ে তুমি এটা করবে তা হলো নামাজের মাধ্যমে তুমি আমাকে স্মরণ করবে। এজন্যই তোমার নামাজ পড়া দরকার। 


আচ্ছা পরিশেষে, এজন্যই তোমার এটা করা উচিত। কিন্তু তুমি এটা করছ বলেই, সঠিক নিয়ত সহকারে আল্লাহ বলছেন কেবল এখানেই শেষ নয়, এর কিছু উপকারিতাও আছে। কিছু ভালো জিনিস তোমার পথে আসবে যখন তুমি সত্যি সত্যি আল্লাহকে স্মরণ করবে। যখন তুমি আল্লাহকে স্মরণ করবে যেভাবে তিনি চান সেভাবে, আর যে উপায়ে তিনি চান তা হলো এই নামাজগুলোর মাধ্যমে। 


তুমি যদি এটা করতে পারো আল্লাহ বলছেন, (ইন্নাস সালাতা তানহা আনিল ফাহশায়ি ওয়াল মুনকার)। এমনকি এই আয়াতেও (ওয়া লা জিকরুল্লাহি আকবার)। তিনি বলছেন, নামাজের মধ্যে এই উপকারটি আছে যে এটা তোমাকে অশ্লীলতায় পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে। 


কারণ অশ্লীলতা তোমার চারপাশে বিরাজমান। আর আমি প্রিয় পুত্র, তোমাকে এটার সম্মুখীন হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারব না। অশ্লীলতা তোমার ফোনে, অশ্লীলতা তোমার স্কুলে, অশ্লীলতা তোমার বন্ধুদের মাঝে, অশ্লীলতা ঈদের অনুষ্ঠানে যখন কোনো কর্নারে গিয়ে বন্ধুদের আড্ডা দাও। অশ্লীলতার উপস্থিতি তুমি সর্বত্র দেখতে পাবে। প্রতিবার যখনই তুমি অশ্লীলতার দিকে এগিয়ে যাবে তোমার অন্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আর আল্লাহ বলছেন যদি তুমি এই নামাজগুলো আদায়ে যত্নবান হও, এগুলো তোমাকে অশ্লীলতার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করবে। 


একবার যদি তুমি অশ্লীলতায় ডুবে যাও, তখন তুমি অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। যেমন তুমি যদি দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নাও, প্রথম প্রথম তোমার কাশি আসবে। কিন্তু যদি এতে বেশিক্ষণ অবস্থান করো, একসময় এতে তুমি অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। অশ্লীলতাও ঠিক এরকম। এতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকলে একসময় এটাকে আর বড় অপরাধ বলে মনে হবে না। নিজেকে এর থেকে রক্ষা করার কোনো গরজ অনুভব করবে না। আর কারণ তোমার প্রতিরোধ ব্যবস্থা দূষিত হয়ে গেছে। এরপর তুমি এমনকি আরো বিষাক্ত আচরণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। এমনকি আরো জঘন্য বিষয় (ওয়াল মুনকার), এমনকি আরো ঘৃণ্য কাজও তোমার দ্বারা সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে। অধঃপতনের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া থেকে এই নামাজগুলো তোমাকে রক্ষা করবে। 


এই জন্যই তোমার নামাজ পড়া দরকার। এই সমস্ত কারণেই তোমার নামাজ পড়া প্রয়োজন। আমি বলেছি এইজন্য না, এই সমগ্র ভ্রমণের শেষে সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণরূপে তোমার। কারণ আল্লাহ হয়তো আগামীকালই আমাকে নিয়ে যেতে পারেন। আল্লাহ হয়তো আমাকে এক বছরের মধ্যেই নিয়ে যেতে পারেন। তোমার এবং আমার মাঝে যে এই সম্পর্কটা বর্তমানে আছে, এমনকি যদি আমরা ১০০ বছরও বাঁচি, আমরা এর চেয়ে বেশি বাঁচতে পারব না। একটা সময় আছে যখন এর সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু ওই সম্পর্কটি—তুমি যদি সত্যিই ওই সম্পর্কটি সম্মান করতে চাও, নামাজ পড়ো। তোমার প্রতি এটাই আমার উপদেশ। 


এখন আমি পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে কথা বলব। এটা হবে ছোট্ট একটা রিমাইন্ডার আমার জন্য এবং আমাদের সবার জন্য। আমাদের পিতা-মাতাদের জন্য। সন্তানাদি আল্লাহ প্রদত্ত একটা নিয়ামত। তাদেরকে এজন্য দেওয়া হয়নি যেন আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যত বেশি আমরা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইব, তত বেশি হতাশ হব সকল অবস্থাতেই। আমি দেখেছি এমনটা। বিশেষ করে যে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের দ্বীনের সুরক্ষা করতে চায়, তারা যত বেশি সন্তানদের ওপর জোর করে দ্বীন চাপিয়ে দিতে চায়, তত বেশি ওই ছেলেমেয়েগুলো অদ্ভুত সব উপায়ে বিদ্রোহ প্রকাশ করে। কারণ যে বিষয়টা আল্লাহ চান আপনি তাদেরকে প্রদান করুন, আপনার ছেলেমেয়েদের কাছে আপনার যে সুযোগ আছে, সেটা তাদেরকে আপনার আদেশ-নিষেধ মানতে বাধ্য করার জন্য নয়। সুযোগটা এজন্য দেওয়া হয়েছে যেন আপনি তাদেরকে এমন সব বিষয়ে চিন্তা করাতে পারেন যা শুধু আপনার পক্ষেই চিন্তা করানো সম্ভব। তাদেরকে এমন সব বিষয়ে পছন্দ করাতে পারেন যা শুধু আপনার পক্ষেই পছন্দ করানো সম্ভব। 


আপনার বাচ্চাটা বাস্কেটবল পছন্দ করে কারণ সে আপনাকে বাস্কেটবল খেলতে দেখেছে। সে প্লেস্টেশন পছন্দ করে কারণ সে তার বাবাকে প্লেস্টেশনে খেলতে দেখেছে। এভাবে আপনি বাচ্চাটার অন্তরে কোনো কিছুর জন্য ভালোবাসা তৈরি করে দিতে পারেন। কারণ আপনি যেরকম, আপনার পক্ষে এটা করা সম্ভব। আর যখন বাচ্চাদেরকে বলতে থাকেন "তোমার হোমওয়ার্ক করো, তোমার হোমওয়ার্ক করো"—আপনার সন্তানের বয়স যখন ৪০ হবে সে তখন বলবে না "আমি হোমওয়ার্ক ভালোবাসি।" কিন্তু ৪০ বছর বয়সেও সে বলবে "আমি বাস্কেটবল ভালোবাসি, আমার বাবা সবসময় বাস্কেটবল খেলতেন।" আপনি যা ভালোবাসেন তা ট্রান্সফার হয়ে তার কাছে চলে যায়। আর যা করতে বলেন তা প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়। 


এমনটি আপনার ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। আপনার ছেলেমেয়েদের কথা ভুলে যান। আপনার নিজের বাস্তবতাও এটাই। আপনার বাবার কিছু কিছু জিনিস যে আপনি এখনো পছন্দ করেন তা ভালোবাসার মাধ্যমে আপনার নিকট ট্রান্সফার হয়েছিল। আর আপনার বাবার ওই ব্যাপারগুলো আপনি অপছন্দ করতেন যা তিনি জোর করে আপনাকে গেলাতে চেয়েছিলেন। এখানে উপবিষ্ট প্রত্যেকের বাস্তবতা এটাই। শুধু সেগুলোই গ্রহণ করেছি যেগুলো ভালোবাসার মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়েছিল। 


ঠিক এই ইশারাটাই আমাদের পিতামাতাদেরকে দেওয়া হয়েছে। সূরাতুল ইসরার এই আয়াতে: (রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা)। রাব্বায়ানি মানে যখন তারবিয়া ব্যবহার করা হয়—একটি চারা গাছ বড় করার জন্য আপনাকে চারা গাছটির যত্ন নিতে হবে। এর সযত্নে প্রতিপালন করতে হবে। গাছটির প্রতি চিৎকার-চেঁচামেচি করলে তো হবে না, "তাড়াতাড়ি বড় হও, তাড়াতাড়ি লম্বা হও।" আপনার একে সময় প্রদান করতে হবে। অনেক সময় পোকামাকড় এসে এর পাতাগুলো খেয়ে ফেলতে চাইবে, আপনাকে তখন পোকামাকড় সরিয়ে দিতে হবে। কখনো কখনো একটু কঠোর আচরণ করতে হবে, শুধু ততটুকুই যেন পোকামাকড়গুলো দূর হয়ে যায়। এরপর আবারও এতে পানি দিতে হবে। আমাদের বাচ্চাদের সাথে আমাদের উদাহরণটা ঠিক এমনই। 


ঠিক এ কারণেই আমরা আমাদের মাতা-পিতার জন্য এই দোয়াটা করি। আমি দোয়া করছি আল্লাহ যেন আমাদের সন্তানদেরকে হিদায়াত দান করেন যা শুধু তাঁর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। দোয়া করছি আল্লাহ তাদের অন্তরে ইস্তিকামাহ প্রদান করুন যেন তারা তাদের জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আরো দোয়া করছি আল্লাহ তাদেরকে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ার মতো করুন যা তিনি আমাদের সবার জন্য করেছিলেন: (রাব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতি)। "হে আমার রব, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।" 


আল্লাহ তাআলা এখানে উপস্থিত পিতা-মাতাদেরকে, আমাকে সহ সবাইকে এমন দৃষ্টান্তে পরিণত করুন যে আল্লাহকে ভালোবাসে এবং যে নামাজকে ভালোবাসে, যেন আমাদের ছেলেমেয়েরা নামাজের প্রেমে পড়ে যায়। আমরা যেভাবে নামাজকে ভালোবাসি তা দেখে। 


বারাকাল্লাহু লি ওয়ালাকুম ফিল কুরআনিল হাকিম।