শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, কিবোর্ডের একটানা খটখট শব্দ, আর নিত্যদিনের ইঁদুর দৌড় থেকে নিজেকে যখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে, তখন মন পাড়ি জমায় এক অজানা গন্তব্যে। এই ব্লগের প্রতিটি শব্দ আমার সেই কাল্পনিক অথচ একান্ত ব্যক্তিগত এক যাত্রার গল্প, যেখানে সময় কোনো ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা নয়, আর গন্তব্য কোনো মানচিত্রে আঁকা নেই। আমার নাম মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, আর আজ আমি আপনাদের নিয়ে যাব আমার সেই স্বপ্নের নীল জলরাশিতে, যেখানে আমি খুঁজে পেয়েছি নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাকে।
আমার এই যাত্রার শুরুটা হয়েছিল মনের গহিনে জমে থাকা কিছু না বলা কবিতা আর বিষণ্ণতার মেঘ থেকে। প্রতিদিনের রুটিনবদ্ধ জীবনে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ি যে, নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সময়টুকুও আমাদের থাকে না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, অন্তত কল্পনার জগতে হলেও এমন এক জায়গায় যাব, যেখানে শুধু আমি থাকব আর আমার নিস্তব্ধতা। একটি ছোট কিন্তু অত্যাধুনিক ইয়টের ডেক, চারদিকে কেবল অথৈ নীল সমুদ্র, আর উপরে ঝকঝকে আকাশ—এটাই ছিল আমার সেই কাল্পনিক যাত্রার ক্যানভাস।
![]() |
| Mohammad Shahidul Islam |
ছবিতে যেমনটি দেখা যায়, ঠিক সেই দৃশ্যটির মতোই নিজেকে কল্পনা করলাম। পরনে হালকা আকাশি রঙের শার্ট, যা সমুদ্রের নীলের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সাদা ট্রাউজার্স পরা অবস্থায় ইয়টের একেবারে সামনের দিকে, কাঠের ডেকে পা মুড়ে বসে আছি। রোদে চিকচিক করা সমুদ্রের ঢেউগুলো যখন ইয়টের গায়ে আছড়ে পড়ছে, তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমি যেন পেছনের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসছি; এই হাসি কোনো ক্যামেরার জন্য নয়, এই হাসি হলো ফেলে আসা শহরের যান্ত্রিক জীবনের প্রতি এক নীরব বিদায়। যে মানুষটা প্রতিদিন এসইও, র্যাংকিং, আর অ্যালগরিদমের গোলকধাঁধায় আটকে থাকে, সে আজ সম্পূর্ণ স্বাধীন।
সমুদ্রের মাঝখানে বসে যখন আমি চারদিকে তাকাই, তখন মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ, সমস্ত অপ্রকাশিত প্রেমের কবিতা এই বিশাল জলরাশিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এই নিস্তব্ধতার মাঝে আমি যেন শুনতে পাচ্ছিলাম আমার নিজের হৃদস্পন্দন। মনে পড়ছিল সেই সব দিনগুলোর কথা, যখন একটা ভালো কবিতা লেখার জন্য, একটা নিখুঁত লাইন খোঁজার জন্য রাতের পর রাত জেগে কাটিয়েছি। আজ এখানে, এই অনন্ত নীলের মাঝে, প্রকৃতি নিজেই যেন এক মহাকাব্য লিখে চলেছে।
সময়ের থমকে যাওয়া এক দুপুর
দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হতে চলল, রোদের তীব্রতা কমে গিয়ে এক মোলায়েম সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ল সমুদ্রের বুকে। আমি ডেক থেকে উঠে ইয়টের রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। জলের দিকে তাকাতেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, "কী খুঁজছি আমি?" উত্তরটা খুব সহজ ছিল—শান্তি। আমরা সারাজীবন অর্থের পেছনে, ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটে বেড়াই, কিন্তু দিনশেষে আমাদের মন এমন একটা আশ্রয় খোঁজে যেখানে কোনো প্রতিযোগিতা নেই।
আমি আমার কাল্পনিক যাত্রায় ইয়টটিকে এমন এক অজ্ঞাত দ্বীপের দিকে নিয়ে গেলাম, যার কোনো নাম নেই। দূর থেকে দ্বীপটিকে একটি সবুজ বিন্দুর মতো মনে হচ্ছিল। ধীরে ধীরে যখন আমি দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা বালুর এক বিস্তীর্ণ সৈকত। সেখানে কোনো মানুষের পায়ের ছাপ নেই। আমি ইয়ট থেকে নেমে সেই বালুকাবেলায় খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। পায়ের নিচে নরম বালু আর হালকা ঢেউয়ের স্পর্শ আমাকে এক অদ্ভুত শিহরণ দিল।
দ্বীপের ভেতরের দিকে একটু এগোতেই দেখতে পেলাম সারি সারি নারকেল আর ঝাউ গাছ। বাতাসের তালে গাছগুলোর দোল খাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে। আমি একটা বড় গাছের নিচে বসলাম। সাথে কোনো স্মার্টফোন নেই, ল্যাপটপ নেই, এমনকি কোনো বইও নেই। শুধু আমি আর আমার চারপাশের এই অকৃত্রিম প্রকৃতি।
সন্ধ্যার বিষণ্ণতা ও তারার মেলা
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তে শুরু করল, তখন আকাশটা যেন এক বিশাল রঙের ক্যানভাসে পরিণত হলো। লাল, কমলা, আর বেগুনির এক অপূর্ব মিশ্রণ। এই গোধূলি লগ্নে আমার মনের ভেতর এক ধরনের মিষ্টি বিষণ্ণতা ভর করল। জীবনের কিছু না পাওয়া, কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি এই সময়টায় খুব বেশি মনে পড়ে। কিন্তু এই বিষণ্ণতা আমাকে কষ্ট দিচ্ছিল না; বরং এটি আমাকে এক ধরনের অদ্ভুত তৃপ্তি দিচ্ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, বিষণ্ণতাও জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঠিক যেমন রাতের অন্ধকারের পর সকালের আলো আসে।
ধীরে ধীরে রাত নেমে এল। সমুদ্রের মাঝখানে রাতের আকাশ যে কতটা সুন্দর হতে পারে, তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। শহরের আকাশে আমরা কটি তারাই বা দেখতে পাই? কিন্তু এখানে, এই নির্জন দ্বীপে, মনে হলো যেন পুরো গ্যালাক্সি আমার চোখের সামনে বিছানো। আমি বালুর ওপর শুয়ে পড়ে সেই অনন্ত নক্ষত্রমণ্ডলির দিকে তাকিয়ে রইলাম। তখন মনে হলো, এই সুবিশাল মহাবিশ্বে আমাদের অস্তিত্ব কতই না ক্ষুদ্র! অথচ আমরা নিজেদের অহংকার, রাগ, আর হতাশা নিয়ে কতই না ব্যস্ত থাকি।
নতুন সকালের জাগরণ
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন ভোরের প্রথম আলো ফুটল, আমি আবার ইয়টে ফিরে এলাম। সমুদ্রের বুক চিরে সূর্য ওঠার সেই দৃশ্য আমাকে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা দিল। আমি অনুভব করলাম, আমার ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা যেন সমুদ্রের নোনা জলে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমি এখন এক নতুন মানুষ।
এই কাল্পনিক ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে যে, মাঝে মাঝে নিজেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়াটা কতটা জরুরি। আমরা যত বেশি বাইরের পৃথিবীর সাথে যুক্ত হচ্ছি, তত বেশি নিজের ভেতর থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। তাই সুযোগ পেলেই আমাদের উচিত কল্পনার ডানায় ভর করে এমন কোনো জায়গায় হারিয়ে যাওয়া, যেখানে আমরা নিজেদের সাথে নতুন করে পরিচিত হতে পারি।
আমার এই যাত্রা হয়তো বাস্তবে ঘটেনি, কিন্তু আমার মনের গভীরে এটি এক চিরস্থায়ী দাগ কেটে গেছে। যখনই আমি শহরের জ্যামে আটকে থাকব, কিংবা কোনো কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠব, আমি চোখ বন্ধ করে আবার সেই ইয়টের ডেকে ফিরে যাব। গায়ে সেই হালকা আকাশি শার্ট, মুখে সেই প্রশান্তির হাসি, আর সামনে সেই অনন্ত নীল জলরাশি। কারণ আমি জানি, আমার মনের ভেতর একটা জায়গা সবসময় আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, যেখানে আমি শুধু আমার নিজের, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত কেবল আমার ইচ্ছেতে তৈরি হয়।

Post a Comment